‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’—এই গান বাঙালির আবেগ, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর সেই চেতনা আবারও বড় এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়নের উদ্যোগ নিলেও, একইসঙ্গে বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অপশক্তিকে প্রশ্রয়ের ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ে। এর পরিণতিতে ৫ আগস্ট ঘটে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের শাসনামলে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধা নির্যাতন, অপমান ও হত্যার ঘটনা সামনে আসে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাও দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ১০ বছরে ৩৫টি ঘটনায় ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত ও ৫৯ জন আহত হন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র দেড় বছরেই ২৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও অন্তত ১৪ জন আহত হন। এসব ঘটনার বড় অংশেই লক্ষ্য করা যায়—মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ই যেন আক্রমণের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রংপুরের তারাগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা, কুমিল্লায় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান, দিনাজপুরে হামলার পর মৃত্যু, টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর বাড়িতে হামলা—এসব ঘটনা দেশবাসীকে নাড়িয়ে দেয়।

অনেক ক্ষেত্রে জমি-বিরোধ বা চাঁদাবাজির অজুহাত দেখানো হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট করা হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা বিতর্কিত ভূমিকা প্রশ্ন তুলেছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ—তাদের যেন বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়াই ছিল ‘অপরাধ’। তবে তারা সেই অপমান মেনে নেননি। বরাবরের মতোই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন অনেক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা।

ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা কি নিরাপদ?

বাংলার মানুষ এখনো বলে—
“আমরা তোমাদের ভুলব না।”
কিন্তু বাস্তবতা যেন বারবার সেই প্রতিশ্রুতিকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version