১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে উপদেষ্টা নিয়োগের প্রচলন শুরু করেন শেখ হাসিনা। পরে এই ধারা অনুসরণ করেন খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সময়ের সঙ্গে উপদেষ্টার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের ক্ষমতা ও ভূমিকা নিয়ে বিতর্কও।

সংবিধানে নেই উপদেষ্টা পদ

সংবিধানে ‘উপদেষ্টা’ নামে কোনো পদের উল্লেখ নেই। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হবে এবং তা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ থাকবে। ৫৬ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সুযোগ থাকলেও তারা শপথ নেন এবং সংসদের কাছে জবাবদিহি করেন।

কিন্তু উপদেষ্টারা শপথ গ্রহণ করেন না, গোপনীয়তার শপথও নয়। ফলে তারা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ নন। এ অবস্থায় শপথবিহীন উপদেষ্টাদের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া সাংবিধানিক কি না—তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে।

রুলস অব বিজনেস কী বলে

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে প্রণীত ‘রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬’-এ প্রধানমন্ত্রীকে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে সংশোধনের মাধ্যমে এ ক্ষমতা আরও স্পষ্ট করা হয়। তবে কোথাও উপদেষ্টাদের মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ক্ষমতা ভোগের সুস্পষ্ট বিধান নেই। বিধিতে বলা হয়েছে, তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করবেন।

২০০৩ থেকে নির্বাহী ক্ষমতা

উপদেষ্টাদের নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়ার নজির শুরু হয় ২০০৩ সালে, খালেদা জিয়ার আমলে। তখন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টাকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে উপদেষ্টারা ফাইলে সই, মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশগ্রহণ এবং একনেক সভায় উপস্থিতির মতো কার্যক্রমে যুক্ত হন।

আদালতে রুল, নিষ্পত্তি হয়নি

২০০৬ সালে উপদেষ্টাদের নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত রুল জারি করেন। তবে প্রায় দুই দশকেও এর নিষ্পত্তি হয়নি। রিটে বলা হয়, সংবিধানে উপদেষ্টা পদের উল্লেখ না থাকায় এবং তারা শপথ না নেওয়ায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ অসাংবিধানিক।

বিভিন্ন সরকারের চর্চা

খালেদা জিয়ার আমলে শুরু হওয়া এ প্রথা পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকারে আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে উপদেষ্টার সংখ্যা ১১ জনে পৌঁছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন মন্ত্রণালয়ের ফাইলে সই ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে অংশ নেন।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ-এর সময়েও শপথবিহীন বিশেষ সহকারীদের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ড. ইউনূসের সময়ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারীরা শপথ ছাড়া নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যায়।

বর্তমান পরিস্থিতি

সম্প্রতি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে কয়েকজনকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও একটি বৈঠককে ‘পরিচিতিমূলক সভা’ বলা হলেও উপদেষ্টাদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

মূল প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, শপথ না নেওয়া এবং সংসদের কাছে জবাবদিহিহীন ব্যক্তির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ প্রশ্নের স্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। হাইকোর্টের রুল নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিষয়টি এখনও আইনি অনিশ্চয়তায় রয়ে গেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version