ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে সারাদেশে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষক নানাভাবে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। শ্রেণিকক্ষ থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা, গলায় জুতার মালা পরানো, কিংবা জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো চিত্র নয়, বরং এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের দলিলে পরিণত হয়েছে।
লাঞ্ছনার শিকার মানুষ গড়ার কারিগররা
বিগত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত আক্রোশ বা রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে একদল উগ্র জনতা শিক্ষকদের ওপর চড়াও হচ্ছে। শুধু শারীরিক আঘাতই নয়, সামাজিকভাবে শিক্ষকদের হেয় প্রতিপন্ন করার এই প্রবণতা জাতির মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
“শিক্ষক হিসেবে আমরা সমাজকে আলো দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমাদেরই অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর মবের উন্মাদনায় আমরা আজ অসহায়,”— আক্ষেপ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক।
এই ৩ হাজার শিক্ষকের মধ্যে অনেকেই আজ ঘরবন্দী। যারা শারীরিক জখম কাটিয়ে উঠেছেন, তাদের মনের ক্ষত এখনো শুকায়নি। অনেক প্রবীণ শিক্ষক, যারা কয়েক দশক ধরে মানুষ গড়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন অপমানের শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। অনেক পরিবারে নেমে এসেছে আর্থিক অনটন, কারণ অনেককে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই কর্মস্থল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের শাসনের শিথিলতা এবং তাৎক্ষণিক বিচারের (Mob Justice) সংস্কৃতি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে যেখানে আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করার কথা, সেখানে জনতাকে আইন হাতে তুলে নিতে দেখা গেছে। এর নেপথ্যে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনও লক্ষ্য করা গেছে।

