বাংলাদেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে

বাংলাদেশে গত বছর দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে বলে জানিয়েছে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস। সংস্থাটির প্রকাশিত বার্ষিক ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’-এ বলা হয়েছে, বিশ্বে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র ১০টি দেশে কেন্দ্রীভূত, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে জাতিসংঘ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে।

১৭ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্যহীনতায়

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিল, যা গবেষণার আওতাভুক্ত জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ।
এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক (ফেজ-৩)’ এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ‘জরুরি (ফেজ-৪)’ পর্যায়ে ছিল।

কিছু উন্নতি হলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে

২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে উচ্চমাত্রার খাদ্যহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৬ লাখ (৩২ শতাংশ) কমেছে। তবে চরম আবহাওয়া ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণে এই উন্নতি ধরে রাখা কঠিন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ

খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে আফগানিস্তান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশকে ‘মাঝারি মাত্রার পুষ্টি সংকট’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

আন্তর্জাতিক সহায়তা কমার শঙ্কা

প্রতিবেদনটিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক খাদ্য সংকটকে আরও গভীর করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য সংকট মোকাবিলায় কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
কৃষকদের জন্য সেচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া মানেই সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে আসছে এবং বৈশ্বিক সংকটের কারণে তা আরও কমতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

উৎপাদন বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া, স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন বাড়ানো এবং সেচব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
অন্যথায় দেশের খাদ্য সংকট আরও তীব্র হয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর বড় চাপ তৈরি করবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version